গত ২৪ জুলাই গুরুকুল, শান্তিনিকেতনে "দল নাট্যগোষ্ঠী"র উপস্থাপনায় আরো একটি সুন্দর প্রযোজনা নজর কেড়েছে শান্তিনিকেতনবাসীর। এর আগে গত মার্চ মাসে বিশ্বভারতীর "লিপিকা প্রেক্ষাগৃহে" এই নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনায় বাদল সরকারের 'সারারাত্তির' নাটকটি যারা দেখেছেন তারা জানেন যে হাড়ে মাসে নাটকটি তাদের কতখানি ভাবিয়ে তুলেছিলো।
তাদের এবারের নাটক 'নির্ভার'। নাটককার শান্তনু বিশ্বাসের লেখা এই নাটকটির নির্দেশনা করেছেন বিভাস বিষ্ণু চৌধুরী। বর্তমানে নাটক পড়া, করা ও দেখার চর্চা যে প্রতিনিয়ত কমে আসছে তাতে সন্দেহ নেই। আর রোজকার জীবনের নাটকই এখন এত ওঠাপড়ায় ভর্তি যে মঞ্চের নাটক আর তত উৎসাহে হাওয়া দেয় না মানুষের। তবু কিছু মানুষ থাকেন, যারা অনেক প্রতিকূলতা জানার পরেও আঁকড়ে থাকেন। লাথি খেয়েও ঘুরে দাঁড়ান। অপমানেও পথ ছাড়েন না। "দল নাট্যগোষ্ঠী" যেন কিছুটা তেমনই এক পথের শরীক...তাদের যত্ন, আবহ, ভাবনার স্তর সবই যেন কোনও কিছুকে প্রানপণে আঁকড়ে টিকে থাকার এক লড়াইকে চালিত করে।
এবার আসি নাটকের কথায়। নাটকের গল্প প্রথমে খুব সামান্য ভাবেই দাম্পত্য ও তার মধুর বিক্ষেপ এর রূপরেখা ধরে চলতে শুরু করে। এখানে মেয়েটি অভিমানিনী, মেয়েটি সংসার থেকে ক্লান্ত, ভ্রষ্ট। এখনও পর্যন্ত এ গল্প সমাজের গা সওয়া। অন্যদিকে পুরুষটি অনেক বেশী সমর্পিত, উদ্যমী। পুরুষের উদ্যম, ভালোমানুষি কখন যেন মহিলাটির প্রতি বিরক্তি ধরিয়ে দেয়! কেন এক কথা সে বার বার বলে? কীসের এত অসন্তোষ। কেন কোনও ধৈর্য নেই তার? তার স্বামী, তার পুরুষ তাকে প্রানপণে আঁকড়ে রাখতে চাইবার পরেও এত কীসের উদাসীনতা তার? এ কী কাঠিন্য? সে কি জানে না - সংসারে থাকতে গেলে সংটাকেই সার করতে হয়!
উত্তর আসে পরে পরে। সংসারে ভালোবাসা কম কিছু মানা যায়। সম্পর্কে লেনদেনের বোঝাপড়ার ব্যবসায়ীকতাও আমরা বুঝি! কিন্তু অপমান! মনুষ্যত্বের অপমান! একা মানুষের নিতান্ত অপারগতার অবমাননা! সহ্য করা যায় সেসব? এখানেই উঠে এসেছে আসল প্রশ্ন। আমরা আসলে ভুলে যাই, যার যা ভাঙ্গন সেই ভাঙ্গন শুধুই তার একার। সেখানে আমরা নিশ্চুপে তার পাশে বসতে পারি। তার মাথায় রাখতে পারি অনাবিল মায়ার হাত। কিন্তু তাকে সুখে রাখবো ভেবে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলা যায়? ভালোবাসি ভাবলেই তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে মতামত নিয়ে ফেলা যায়? ভালোবাসি বললেই ভালো রাখা যায়? ভালোবাসায় একে অপরের প্রতি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিচার ভাবনার যে অদৃশ্য লাইন, কখন যে আমরা না বুঝেই তার এ পাশ ও পাশ করে ফেলি তার দাগ কেবল সময় ধরে রাখে... আমরা তাকে মেটানোর ক্ষমতা রাখি কি এক জন্মে?
প্রশ্নের উত্তর পেতে এই নাটক বোধ হয় আমাদের সবার দেখা দরকার। নাটকের মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রী তড়িৎ রায়চৌধুরী (পুরুষ), শ্রীমতি মধুশ্রী চ্যাটার্জী (নারী ) এবং শ্রীমতি শ্রীময়ী ঘোষ (স্বপ্ন অথবা বিবেচনার স্বর)। নারী পুরুষের ভালোবাসা ও প্রেমজাত সম্পর্কের যে জটিল আবর্ত সেই ওঠাপড়ায় তড়িৎ ও মধুশ্রীর অভিনয় আমাদের স্তব্ধ করে। তাদের কথা ও ভাবাবেশ মানুষকে চলে যেতে বাধ্য করে সেই ন্যায় নৈতিকতা এবং ভালো রাখতে চাইবার দোলাচলের অন্দরমহলে। যেখানে স্বপ্ন অথবা বিবেক যেন সেই হাওয়াতে মৃদুমন্দ দোল দিয়ে যায়। সত্যিই কি ভালোবাসা পারে সব ভুল ক্ষমা করে সব অবিবেচনাকে আদর করে বুকে তুলে নিতে?
তাহলে এই নাটক দেখতে হবে, ভাবতে হবে। ভাবতে হবে কেন সমূলে নিজেকে ছিঁড়ে নেবার পরেও ফিরে আসতে হয়। ভাবতে হবে কেন বার বার চলে যাবো বললেও চলে যাওয়া যায় না! ভাবতে হবে, "দুই মানুষের মাঝে যে অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে সে বাঁশি বাজে না।"
Comments
Post a Comment